লেখক- শ্রেয়া দত্ত
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর পাড়ার পূজামণ্ডপে সন্ধ্যার আলোকসজ্জা,ধূনোর গন্ধ —সব মিলিয়ে যেন চারদিকে এক রঙিন ভালোবাসার ছোঁয়া সৃষ্টি করেছে।ঠিক এই সময়েই উত্তর কলকাতার কাছে এক পুরনো বাড়িতে বছর চারেক পর ফিরল অপর্ণা।সে এখন কলকাতার বাইরে এক নামী আর্ট কলেজের শিক্ষিকা। কিন্তু তার শিকড়ের টান এই পাড়াতেই,যেখানে ছিল তার প্রথম ভালোবাসা—সৃজন।
অপর্ণা ফিরে এলেও কারও সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ রাখেনি।তবে পূজার আনন্দে মেতে ওঠা পাড়ার সকলেই ওকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল।কিন্তু তাঁর মনে যেন এক শূন্যতা,এক অপেক্ষা—যেন তাঁর জীবনে কিছু একটা অপূর্ণ থেকে গিয়েছে।ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় পাড়ার ‘কুহেলী সংঘ’-এর পূজামণ্ডপে সবাই মেতে উঠেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।অপর্ণা আড়ালে বসে সবকিছু চুপচাপ দেখতে থাকে।হঠাৎ করেই তার কানে ভেসে এল পরিচিত এক কণ্ঠ—'অপর্ণা' সে ঘুরে তাকিয়ে দেখল সৃজন।চোখে চশমা, হালকা দাড়ি, আর আগের সেই হাসিটা—কিছুই বদলায়নি। মুহূর্তেই যেন পুরনো দিনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ফিরে এল অপর্ণার। কলেজে পড়ার সময়কার সেই কাঁচা প্রেম, প্রথম হাত ধরা, পূজার রাতে একসঙ্গে ঠাকুর দেখা,ভোগ খাওয়া,আর হঠাৎ একদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।তারপর এতদিন পর আবার দুজনে মুখোমুখি হল। 'তুমি তো কলকাতার বাইরে ছিলে কবে ফিরলে?' সৃজন জিজ্ঞেস করল।'এই তো কিছুদিন হল এসেছি,এখন আর্ট কলেজে পড়াই'- অপর্ণা হাসল। 'অনেক বছর পর তোমার সাথে দেখা ভালো লাগছে তোমায় দেখে'- সৃজন বলল, চোখে তাঁর একটু চাপা অভিমান।সন্ধ্যেটা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছিল স্মৃতিময়তায়। দুজনে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মণ্ডপের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।কথা হচ্ছিল ছেলেবেলা, বন্ধুদের, আর সেই ফেলে আসা সময় নিয়ে যা তারা একসাথে কাটিয়ে ছিল। অনিন্দিতা প্রশ্ন করল-'তুমি হঠাৎ করে হারিয়ে গেলে কেন?কাউকে না বলে চলে গেলে একবার যোগাযোগও করলে না।' সৃজন বলল নিচু গলায়- 'আসলে বাবার মৃত্যু,তারপর সংসারের দায়িত্ব আর তোমাকে মনের মতো কিছু দিতে পারব না ভেবেই দূরে সরে গেছিলাম।জানি ভুল ছিল কিন্তু আমি বাধ্য হয়েছিলাম।অপর্ণা চুপ করে গেল।তারপর আস্তে আস্তে বলল-'অভিমানের থেকে বেশি ছিল অপেক্ষা।কত পূজা কেটেছে সেই অপেক্ষায়—হয়তো তোমার সাথে আবার দেখা হবে, হয়তো আবার সেই পুরনো মাধুর্য ফিরে আসবে।' সপ্তমীর দিন সকালেই দুজনে আবার দেখা করল এবার আর অতীতের কোনো স্মৃতিতে আটকে না থেকে বর্তমানকে ছুঁয়ে দেখতে চাইল তারা।একসঙ্গে ভোগ বিতরণে সাহায্য করা থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো,অনুষ্ঠানে সাহায্য সবকিছুই একসাথে করে সৃজন আর অপর্ণা।তারপর হঠাৎই ছোটদের নাটকে সৃজন অপর্ণার আঁকা ব্যাকড্রপটা দেখে বলল -'তুমি এখনও দারুণ আঁকো। তোমার ছবিতে একটা অদ্ভুত টান আছে।' এই শুনে অপর্ণা একটু হাসল।অষ্টমী পেরিয়ে নবমীর রাতে যখন মণ্ডপে সন্ধিপূজার ধুনুচি নাচ হচ্ছিল।তখন হঠাৎ করেই সৃজন অপর্ণার হাতটা ধরে বলল-'অপর্ণা,তুমি কি আজও আমার সেই মনের মানুষ যাকে আমি এতদিন থেকে খুঁজছিলাম?' অপর্ণা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল-'হয়তো কখনও ছিলাম না, কিন্তু আজ তোমার এই প্রশ্নেই আমি আমার সব উত্তর পেয়ে গেলাম।'দশমীর সকালে যখন সিঁদুরখেলা চলছিল, তখন অপর্ণা আর সৃজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল পূজামণ্ডপের পাশে। চারদিকে বিদায়ের সুর, কিন্তু তাদের চোখে ছিল নতুন আশার আলো।
পূজা তো প্রতি বছর আসে,কিন্তু কিছু পূজা হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।এ পূজা ছিল তেমনই—যেখানে সৃজন আর অপর্ণার অপেক্ষার পরিসমাপ্তি হল।তারা দুজনে একসাথে নতুন করে নিজেদের 'মনের মানুষ' এর সাথে পথ চলা শুরু করল।

0 Comments