তিনি তখন প্রবাসী পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। একদিন সন্ধ্যাবেলায় চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কবির জোড়াসাঁকোর বাড়িতে দেখা করতে গেছেন। চারু বাবু গিয়ে দেখলেন কবির কাছে জব্বর ভিড়। লোকের পর লোক আসছেন। কেউ এসে নতুন গান শিখে নিচ্ছেন। কেউ তাকে দিয়ে কিছু পড়িয়ে নিচ্ছেন। কেউ বাজে কথা বলে কবির সময় নষ্ট করছেন। আর কবি সবার কথা মন দিয়ে শুনে সকলের মান রক্ষা করছেন।
কিছুক্ষণ শুনে কবি তাঁকে বললেন – “তোমার সাথে বোধহয় চারুর পরিচয় নেই। ও সম্পাদক মানুষ ওর সাথে আলাপ করে রাখলে তোমার ফ্রুডের কিছু হিল্লে হতে পারে।
সে ভদ্রলোক কবির পরিহাস বুঝতে পারলেন না। তাই তিনি কেবল একবার চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের দিকে তাকিয়ে “ও” বলে আবার বকতে শুরু করলেন। তার বকুনি আর থামে না। এদিকে প্রায় রাত দশটা বাজার জোগাড় চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে ফিরতে হবে অনেকদূর। তিনি যাওয়ার উপক্রম করলেন।
চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে যেতে দেখে কবি বললেন – “চারু, তুমি চলে যেওনা। তোমার সঙ্গে আমার ভীষণ দরকার আছে। আর একটু বোস।
তার প্রায় একঘণ্টা পরে ভদ্রলোক তার বক্তৃতা থামিয়ে চলে গেলেন। ভদ্রলোক চলে গেলে কবি বেশ রাগিত ভাবে বললেন, - “চারু তোমাকে আমার বন্ধু বলেই এতদিন জানতাম, কিন্তু সে ভ্রম আমার আজ ঘুচে গেল।
চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় বাবু বিস্মিত ভাবে কবির মুখের দিকে চাইতেই কবির হেসে বললেন, - “তুমি আমাকে এই ফ্রুডোর ভুতের হাতে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিলে কোন আক্কেলে”।
চারুচন্দ্র বাবু কোথায় কি অন্যায় হয়ে গেল ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলেন। কবির এই কথা শুনে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
এবার ফ্রুডোর ভুত ভদ্রলোক ফ্রয়েড নামকে কি ভাবে বারে বারে ফ্রুডো উচ্চারণ করছিলেন এই নিয়ে কবি এবং চারুচন্দ্র বাবু উভয়েই খুব হাসতে লাগলেন।
পুনশ্চ:
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়:
জনপ্রিয়তার নিরিখে বিংশ শতকের বিখ্যাত গল্পকারদের মধ্যে অন্যতম চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ১৮৭৭ সালের ১১ই অক্টোবর তারিখে মালদহের চাঁচলে জন্ম গ্রহণ করেন। যদিও তাদের আদি বাসস্থান ছিল বর্তমান বাংলাদেশের যশোরে। বাবা নাম ছিল গোপাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর মায়ের নাম ছিল মুক্তকেশী দেবী।
১৮৯৫ সালে বলাগড় হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৮৯৬ সালে জেনারেল অ্যাসেম্ব্লিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফ.এ এবং ১৮৯৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।
১৮৯৬ সালে দুমকা নিবাসী রাধারানী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। কিন্তু বিবাহের মাত্র চার বছর পরেই ১৯০০ সালে রাধারানীর মৃত্যু হলে তিনি পদ্মাবতী দেবীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। অধ্যাপক কনক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এঁদের সন্তান।
তার কর্মজীবনের সূত্রপাত ইন্ডিয়ান প্রেস অ্যান্ড পাবলিশিং হাউসে। পরবর্তী কালে তিনি বিখ্যাত ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। ছিল বাংলা ভাষা ও শব্দতত্ত্বে অনায়াস দক্ষতা। আর সেই কারণে ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি এই একই অধ্যাপক পদে যোগদান ১৯২৪ সালে।
তার সাহিত্য জীবনের শুরু “মেঘদূত”, “মাঘ” সহ প্রভৃতি পত্রিকায় সাহিত্যের সমালোচক হিসেব। তিনি যখন প্রবাসী পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন তখন প্রকাশিত হয় তার প্রথম ছোট গল্প “মরমের কথা”।
তাঁর রচিত পঁচিশটী উপন্যাসের মধ্যে ‘আগুনের ফুলকি’ (১৩২১), ‘স্রোতের ফুল’ (১৩২২), ‘পরগাছা’ (১৯১৭), ‘দুই তীর’ (১৯১৮), ‘হেরফের’ (১৯১৮), ‘পঙ্কতিলক’ (১৯১৯), ‘দোটানা’ (১৯২০), ‘আলোকপাত’ (১৯২০), ‘রূপের ফাঁদে’ (১৯২৫), ‘সুরবাঁধা’ (১৯৩৭), ‘অগ্নিহোত্রী’ (১৯০৮) ইত্যাদি খুব বিখ্যাত।
ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন, বেশ কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন ছোটদের উপযোগী করে। মহাকবি ভাসের 'অবিমারক' নাটকের এবং কয়েকটি উপন্যাস ও কিশোরপাঠ্য গ্রন্থের সার্থক অনুবাদ করেছেন। 'ভাতের জন্মকথা' তাঁর একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য শিশুপাঠ্য গ্রন্থ। তবে তিনি সমধিক পরিচিত তার রবীন্দ্র-গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘রবি-রশ্মি’র জন্য।
চারুচন্দ্রের মৃত্যু হয় ১৯৩৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর।
তথ্যসূত্রঃ
১) রবীন্দ্রনাথের হাস্য পরিহাস - গোপালচন্দ্র রায়। (পাতা ৩)
২) সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান।
৩) উইকিপিডিয়া।

0 Comments